জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফের বরখাস্ত                 লন্ডনে মুড়িয়া ইউনিয়র ঐক্য পরিষদ গঠনের লক্ষে সভা অনুষ্ঠিত                 সিলেট মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেলেন যারা                 কুশিয়ারা নদীর ভাঙ্গন থামছেইনা                 ইতালিতে চার দিন ব্যাপি বৈশাখী উৎসব পালিত                 সিলেট জেলা বিএনপির কমিটিতে স্থান পেলেন বিয়ানীবাজারের তিন নেতা                 সংরক্ষিত আসনে মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন রোশনা ও মালিকা                

বিয়ানীবাজারের মানুষ পৌরসভার জন্য আন্দোলন করেছে

: বিয়ানীবাজার কন্ঠ
Published: 13 04 2017     Thursday   ||   Updated: 13 04 2017     Thursday
বিয়ানীবাজারের মানুষ পৌরসভার জন্য আন্দোলন করেছে

ফারুক যোশী

বাংলাদেশের একটা থানা শহরের নাম বিয়ানীবাজার। এ থানায় একটা পৌরসভা ঘোষণা করা হয়েছিল আজ থেকে ষোলো বছর আগে। বিয়ানীবাজার ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আদালতে মামলা ঠুকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তখন সে পৌরসভার (বিয়ানীবাজার) প্রশাসক (মেয়র নন) মনোনীত হন। সাধারণ নিয়মানুযায়ী প্রশাসকের মেয়াদ শেষে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিগত ষোলো বছর সে পৌরসভার নির্বাচন জনগণ দেখেনি। পৌর চেয়ারম্যান কিংবা মেয়র নন, পৌর প্রশাসক হিসেবে কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি ষোলোটি বছর। এক অদ্ভুত গণতন্ত্র আর আইনের ফাঁকফোকরে বছরের পর বছর এ পৌরসভায় লেগেছিল মামলার জট। এ জট খোলেনি গত ষোলো বছর। একটা গিঁট খুলত আরেকটা লাগত, এভাবেই চলেছে। কেউ এ গিঁটগুলো লাগাত না, প্রচারণা আছে, স্থানীয় পৌর প্রশাসনের ছায়ায়ই চলত এসব গিঁট খোলা-লাগানোর সার্কাস।

দীর্ঘদিন থেকে এ নিয়ে বিয়ানীবাজারের মানুষ আন্দোলন করেছে। বিয়ানীবাজারের সব মানুষ বলব না, উন্নয়নকামী একটা গ্রুপ আন্দোলন করেছে। আন্দোলনে তো আর বিচার বিভাগীয় বিষয় নিষ্পত্তি হয় না। শেষ পর্যন্ত মামলাগুলো নিয়েই লড়তে হয়েছে। স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি লন্ডনে অবস্থানরত বিয়ানীবাজার এলাকার বেশ কজন মানুষের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতায় শেষাবধি একটা জায়গায় গেছে বিয়ানীবাজার পৌরসভা। স্থানীয় এমপি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সমর্থনও ছিল স্বাভাবিকভাবেই। লন্ডনে অবস্থানরত এলাকার ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা দীর্ঘদিন দেশে থেকে এ মামলাগুলো লড়েছেন তারই সহযোদ্ধাদের সমর্থন নিয়ে, তাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে। লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছে তাদের। অবশেষে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির আদেশবলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিয়ানীবাজারের একটা অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন হয়েছে।

এখন নির্বাচন হচ্ছে। আগামী ২৫ এপ্রিল নির্বাচন। এই ষোলো বছর নির্বাচন হয়নি, তাতে কী, আওয়ামী লীগের ষোলোজন নেতা তাদের সংগঠনের কেন্দ্রে মেয়র প্রার্থী হিসাবে নিজেদের নাম দিয়েছিলেন। লন্ডনের সেই সাবেক ছাত্রনেতাই (আব্দুস শুকুর) আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। পৌরসভা নিয়ে তার আদালতপাড়ায় পড়ে থাকা এবং শেষ পর্যন্ত এই এলাকার মানুষের প্রাথমিক বিজয় তার কিংবা তার সহযোগীদের কারণেই সম্ভব হয়েছে। সে কারণে তার প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারটা অবশ্য এলাকার সবাই ধরে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন আরো দুজন। আগের পৌর প্রশাসকও আওয়ামী পরিবারের মানুষ এবং অন্যজনও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি। ওই তিনজনই আওয়ামী লীগের নিজস্ব পরিবারের মানুষ।

দুই. লেখার শুরুটা নিজের এলাকা দিয়েই করলাম। সারা দেশের ভেঙে পড়া গণতন্ত্র এবং সাংগঠনিক গণতন্ত্রের চিত্রই আমার এ উপজেলা। দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায়। বলা হয়, একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাঝেই চালানো হচ্ছে দেশ। সাংবিধানিকভাবে এটাই সঠিক। কিন্তু গত নির্বাচনের হালহকিকতের চিত্র কিন্তু তা নয়। ভোটহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিদের কার্যকলাপ জনমনে প্রশ্নবোধক। ম্যানচেস্টার স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হক জুয়েল গিয়েছিলেন দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়। সিলেটের সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নে নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন তার আত্মীয়। আওয়ামী লীগের একজন ব্রিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে। জেলার প্রভাবশালী নেতাদের সমর্থনে এবং স্থানীয় মাসল-ম্যানদের সহায়তায় বিদ্রোহী প্রার্থী সেখানে জয়ী হয়েছেন। বিজয়ের পর জুয়েল এসেছেন ব্রিটেনে। এখন মামলা ঝুলছে তার নামেও। সেদিন বললেন, তার ভাই ছাত্রলীগ সিলেট জেলা শাখার সাবেক সহসভাপতি এখন কারাগারে অন্তরীণ, নৌকার পক্ষের নির্বাচনী মামলায়। এই হলো সরকার দলের চলমান চিত্র। ক্ষমতায় বলয় টিকিয়ে রাখতে জনপ্রতিনিধিদের চারপাশে গিজগিজ করছে ‘কাউয়া’র দল। যদিও যেখানেই নির্বাচন হচ্ছে, সরকার চেষ্টা করছে নির্বাচন প্রশ্নহীন করার, অথচ সেখানেই সরকারি দল পড়ছে গ্যাঁড়াকলে।

সম্প্রতি হয়েছে কুমিল্লায় নির্বাচন। হয়েছে জগন্নাথপুর, বালাগঞ্জে নির্বাচন। নির্বাচন প্রশ্নহীন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রশংসা পেয়েছে কিন্তু ডুবেছে তরী। আওয়ামী লীগই বলছে ‘কাউয়ার’ আক্রমণে অতিষ্ঠ কৃষক। গোলায় উঠছে না ধান, তার আগেই আঙ্গিনা খালি করছে কাউয়ার দল। যতই ক্ষমতা কুক্ষিগত হচ্ছে, আধিপত্যের জন্য লড়াকু হয়ে উঠছে আওয়ামী যুবকরা এমন কি প্রবীণরাও। আন্দোলনের জোয়ারের স্লোগানে ভাসা বাংলার রাস্তাঘাটে আসছে অঢেল অর্থ। দুই পারের বন্ধনের জন্য (ব্রিজ) আসছে অর্থ। অবকাঠামোর উন্নয়নে অর্থ উড়ছে বাংলায়। এই উড়ন্ত অর্থের জন্য ব্যঘ্র-মূর্তিতে এখন একটা বিশাল শ্রেণি। এদের এখন আধিপত্য প্রয়োজন, আর তাই তো নির্বাচন এলে দ্ব›দ্ব বাধে। একটা ছোট্ট স্থানীয় নির্বাচনেও জনে জনে প্রার্থী হন আওয়ামী পরিবারে। আমার জন্ম আবাস পৌরসভারও সেই একই দশা। সেখানে এখন আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের প্রতিদ্ব›দ্বী। রাজনীতি নেই। বঙ্গবন্ধুর স্লোগানে মুখরিত বঙ্গ সেনাদের দেশ।

তিন. অতি সম্প্রতি আসলে নাটকই হলো রাজশাহী-সিলেট-হবিগঞ্জ শহরের মেয়রের পুনর্বহাল নিয়ে। এ তিনটা নাটক বটে। তিন শহরের তিনজনই প্রায় একই সময়ে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারান্তরীণ হন। দুই বছরেরও অধিক কাল পর তারা আইনি লড়াই শেষে কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেও চেয়ার পেতে নিজ নিজ জায়গায় আবারো হোঁচট খেয়েছেন। কেউ বসেছেন দুই ঘণ্টা কেউবা আবার ঢুকতেই পারেননি। মেয়রের চেয়ারে বসেছেন, দুই ঘণ্টা বসার পর সিলেটের মেয়রের পদ চলে যায়, আবার মেয়রের আসনে হন আসীন। সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক আর ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন মেয়রের অবর্তমানে রাজশাহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র। তিনি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের চেয়ারটা ছাড়ার লোভ সংবরণ করতে না পেরে মেয়রের কক্ষে তালা লাগিয়ে চলে গিয়েছিলেন। যাই হোক, বহাল-বরখাস্ত প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এখন অবশ্য তারা মেয়র। বলতে হবে এটা ছিল তিনটা নাটক। এই নাটক সরকার তো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেই, এমনকি আইনি প্রক্রিয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।

বিএনপির এখন বিবৃতি-সংস্কৃতির মাঝেই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে, তারা সব কিছুকেই নাটক বলে। তাদের মুখপাত্র জঙ্গি নিধনকে বলেন নাটক, আবার কুমিল্লার নির্বাচনকে প্রথমে আনফেয়ার বললেও এবং পরে ফেয়ার ফলাফল উল্লেখ করে তারা নিজেরাই কিছু কিছু নাটকের জন্ম দিচ্ছেন। অর্থাৎ তারাই কিছু কিছু ব্যাপারকে নাটকীয়তায় নিয়ে যাচ্ছে। সে কারণে তাদের মূল ব্যাপারগুলো হয়ে যাচ্ছে উপেক্ষিত। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, তনু হত্যা, কলেজছাত্র লিমনকে পঙ্গু করে দেয়া, গাইবান্দায় সাঁওতাল পল্লীতে আগুন এ রকম অনেক কিছুই আছে। এগুলোর বাস্তবতাকে ধরেই আগাতে পারত তারা। ইস্যুর প্রয়োজন প্রশংসিত ব্যাপারকে নাটকীয় উল্লেখ করে তাদের বিবৃতি-নির্ভর আন্দোলন আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সরকারও সুযোগ খোঁজে নিচ্ছে।চার. সরকার যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগী হয়ে থাকে, এতে বিরোধী দলের অহেতুক ছুতো খুঁজে ইস্যু বের না করলেই কি নয়। বরং রাজনৈতিকভাবে একটা ভঙ্গুর অবস্থানে থাকা বিরোধীদলের এসবে সমর্থন দিয়ে উদ্যোগ সুদৃঢ় করার জন্য আবদান রাখতে পারে। অন্যদিকে সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবোধক করে তুলছে। তাদের দলীয় কোন্দল অন্তর্দ›দ্ব সারাদেশেই জন্ম দিচ্ছে রুদ্ধশ্বাস সন্ত্রাসের। টেন্ডারবাজি আর অর্থের ভাগবাটোয়ারার সীমাহীন লালসায় এরা এখন দুর্বিনীত ক্যাডার। লিডার নামের বড়ভাই কিংবা বসদের কৃপায় এরা হয়ে উঠছে দলীয় দানব। আর সে কারণে মানুষ যে সরকারের কাউয়াদের দ্বারা পিষ্ঠ হচ্ছে, তা প্রতিটি নির্বাচনই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। হারছে আওয়ামী লীগ, ডুবছে নৌকা।

আগামীর সব নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নেও দলীয় দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করতে হবে সারা দেশে। তবেই হয়তো বিজয় আসতে পারে। জনগণকে আশ্বস্ত করতে হবে। আশ্বস্ত করতে হলে যে কোনো পার্টিকেই পছন্দ করতে হবে দুর্নীতি-দর্বৃত্তায়নের বলয় ভাঙা নিবেদিতপ্রাণ কর্মী কিংবা নেতাদের। নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদেরই মানুষ বিশ্বাস করে। এটা যে দলেরই হোক।

লেখক: ফারুক যোশী : কলাম লেখক ও প্রবাসী সাংবাদিক ।

Share Button
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  



Share Button





April 2017
S S M T W T F
« Mar    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

devolop web-it-home, 2017